যামিনী পেরুনো কামিনী ফুলের মৌ মৌ করা ভোরে
প্রায়ই আসতো উঠোনে আমার এক ঝুনঝুনিওয়ালা
জাদুর মন্ত্রে জানতে চাইতো আমার স্বপ্নের দৈর্ঘ্যটা
শৈশবের সেই সোনালি দিনে স্বপ্নতো হতো সীমিত কেবল
ভূত প্রেতের ভয়ে ভরা , নইলে বড়জোর রূপকথার রূপক।
মাঝে মাঝে দেখতাম পাড়ার পুল থেকে ঝুলে পড়ে গেছি
স্বপ্ন ভাঙ্গা সত্যে আসলে বালিশ থেকেই গড়িয়ে পড়া মাথা।
কৈশোরের চাঞ্চল্যে দেখেছি চানাচুরওয়ালাকে স্কুলের ফটকের বাইরে
এতো দেখি সেই ঝুনঝুনিওয়ালা, ঝোলা ব্যাগে যার রয়েছে স্বপ্নের সম্ভার!
প্রশ্নটা তখনও এক এবং অভিন্ন, “ হে বালক, কতটা দৈর্ঘ্য স্বপ্নের তোমার”?
এ আবার কেমন তরো প্রশ্ন! কিন্তু ততদিনে গজ-ফুটের অঙ্কটা আয়ত্বে আমার
অন্তত ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্য দিয়েই মেপে ফেলি যাবতীয় স্বপ্নের সম্প্রসারণ
তার পর গড়াতে গড়াতে বলটা নিয়ে যাই গোল পোস্টের কাছাকাছি
কখনও স্বপ্নটা সফল হয় চৌকো পোস্টের ভেতরে, কখনও ঘা খায় কাঠের বন্ধনীতে।
কৈশোর ও যৌবনের সীমান্তে যখন, তখনই এক অন্তহীন স্বপ্ন সম্প্রসারিত মনে
ঝুনঝুনি বাজালেন এবার পুরু কাঁচের চশমা পরা এক মহানপুরুষ
রেসকোর্সের ময়দানে তর্জনী তুলে আমাকেই যেন শুধালেন, “ হে কিশোর
প্রাণে পুষে রাখা তোমার স্বপ্ন এখন কতদূর এগুলো”? বিস্ময়ে বিহ্বল এই আমি
স্বপ্ন তখন হাঁটি হাঁটি পায়ে অনেকদূর এগিয়েছে, লাল –সবুজের দ্বৈত রং মাখানো
রবীন্দ্র সঙ্গীতের সুরে সঙ্গ পায় মৃদঙ্গ আমার, সংস্কৃতির উঠোন ভরবে বাঙালিত্বের গৌরবে
সেই স্বপ্নরা যাওয়া আসা করে নীরবে নিভৃতে বৈরি পক্ষের শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে।
তারুণ্যের তরণী যখন বয়ে চলেছি খরস্রোতা এক নদীর বিস্তৃত বুকে
রমনার হ্রদে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা নিয়ে সঙ্গিনী তখন তরুণী কেবল
বেরসিক বাদামওয়ালাটা ঘুর ঘুর করছে বানিজ্যিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে
ও মা এ যে দেখি শৈশবের সেই আলখাল্লা পরা ঝুনঝুনিওয়ালা
সেই পুরোনো প্রশ্ন , “ কই বললে না তো যুবক, স্বপ্নটা কতদূর গড়ালো”?
গড়ের মাঠের মতো পকেট যখন , স্বপ্ন কতদূর যাবে জানিনা কিছুই আমি
বেলি ফুলের মালাবদল অবধি স্বপ্ন গড়িয়েছে বড়জোর, এর বেশিতো কিছুই নয়।
প্রৌঢ়ত্বে পোড় খাওয়া এই সময়েও ঐ দীর্ঘকায় মূর্তমান বিমূর্ত সত্য
এখনও শুধায় , “ স্বপ্নের কি হলো তোমার , কতটাই বা দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ
গভীরতায় এগুলে কতটা তুমি”? জানিনা পরিষ্কার জবাব কোন
স্বপ্নরা বিপন্ন হয়েছে বার বার স্বদেশে বিদেশে সর্বত্রই
বাস্তবে স্বপ্নের দৈর্ঘ্য গেছে কমে , তবু স্বপ্ন নির্মাণের রাজমিস্ত্রি আমি
শক্ত ইঁট গেঁথে চলি নরম বালির অমোচনীয় বন্ধনে প্রতিদিন
কবিতার কন্ঠেই হয়তো স্বপ্নরা পায় ঠাঁই , যখন স্বপ্নে নয় , স্বপ্নভঙ্গেই বিভোর সবাই।
এখনতো আমার ভরসা কেবল ঐ ঝুনঝুনিওয়ালা আলখাল্লা-পরা স্বপ্নের সত্বাই
নইলে কতদূরই বা যাবো আমি, কত মাইল-ক্রোশ , হয়ত হারাবো প্রাপ্তির সবটাই ।
১ লা আগস্ট ২০১৬, ম্যারিল্যান্ড
Copyright@ anis ahmed